|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|

   উপসম্পাদকীয়
  মানবিকীকরণ বাংলাদেশের ভূমি নীতির
  03-05-2016

০৩ মে, ২০১৬ ইং

অনলাইন ডেস্ক

গত ২৪ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু কনভেনশন হলে দু’দিনব্যাপী বিআইডিএস বাংলাদেশের উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনামূলক কথোপকথন (ক্রিটিক্যাল কনভারসেশন)-এর আয়োজন করেছিল। উক্ত অনুষ্ঠানের একটা পর্বের বিষয় ছিল ভূমি ব্যবহার প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনা। ওই আলোচনায় আমি প্যানেলিস্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। সভাপতিত্ব করেছিলেন সাজ্জাদ জহির লেলিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মনজুর হোসেন।

ভূমি নিয়ে আলোচনায় প্রথম যে বিষয়টির কথা সবাই বলেন, তা হচ্ছে বাংলাদেশে জনসংখ্যার অতিমাত্রায় ঘনত্ব। জমি এখানে সোনার টুকরোতে পরিণত হতে চলেছে। এমনকি আমেরিকাতেও জমির যা দাম বাংলাদেশে সেই দাম বেশ অনেকগুণ বেশি (সুদূর পঞ্চগড়ে ১ একর শিল্প জমির বিজ্ঞাপন দাম যেখানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, সেখানে আমেরিকায় ৮০ লাখ টাকায় তার চেয়ে ভালো জমি আপনি শহরাঞ্চলে পেতে পারেন!)। বাংলাদেশের ধনীদের একটা স্বভাব হচ্ছে উত্পাদনশীল প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ না করে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করে সেখানে নিরাপদ বিনিয়োগ করা। একটি ফ্ল্যাটের জায়গায় দশটি ফ্ল্যাট, একটি বাগানবাড়ির জায়গায় ছয়টি বাগানবাড়ি—এইভাবে সম্পদের কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশের ধনীদের একা দোষ দিয়ে কি লাভ। অক্সফামের সর্বশেষ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, সারা দুনিয়ায় ৬৬ জন লোকের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে তা বিশ্বের অর্ধেক মানুষের সম্পদের চেয়েও বেশি। বিল গেটস নিজেও হয়তো জানেন না কোথায় তার কত জমি আছে। বাংলাদেশের ধনীরা জমি কিনে সম্পদ জমানোর বদলে এখন কর ফাঁকি দেয়ার স্বর্গরাজ্যগুলোতে অর্থ পাচার শুরু করেছেন। আমেরিকার একটা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচারের হিসাব দিয়ে থাকে। কিছুদিন আগে পানামা কেলেঙ্কারির খবরও আমরা দেখেছি। সর্বশেষ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ২০১৩ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯.৬৬ বিলিয়ন ডলার, অর্থাত্ প্রায় ১০০০ কোটি ডলার বা ৭৬ (ছিয়াত্তর) হাজার কোটি টাকা। ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী গড়ে ২০০৪-১৩ সালের মধ্যে প্রতিবছর জিডিপির ৩ শতাংশ এবং বাজেটের ১৫ শতাংশ এভাবে পাচার হয়ে গেছে বলে ঐ আমেরিকান থিংক ট্যাংকটি দাবি করছে (দেখুন, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৫, ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সংবাদ)। এই হিসেবগুলো দিচ্ছি এই কারণে যে, এই টাকাগুলো দেশের মধ্যে বিনিয়োগ হলে হয়তো রিয়েল ইস্টেট বা জমির বদলে উত্পাদনশীল খাতেও বিনিয়োগ হতে পারতো, তখন লোকজনের চাকরি হতো, জিডিপি বৃদ্ধি হতো এবং বড়লোকরাও আরও বড়লোক হতে পারতেন কিন্তু বৈধ পথে। অনেকে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য শিল্প জমি নেই। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন কৃষিজমি বেদখল করা চলবে না। তাহলে আমরা শিল্প-কলকারখানার জমি কোথা থেকে পাবো? এটাই তাদের প্রশ্ন। এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে পাল্টা বক্তব্য হলো, সরকার পরিকল্পিতভাবে ২৮টি “স্পেশাল ইকোনোমিক জোন” তৈরি করে জমির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইচ্ছা করলে বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। সেখানে গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি ও পানির ব্যবস্থাও থাকবে। সেখানে সরকার ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আয়োজন করেছে। তবে ঐ জমি বার করার জন্য সরকারকে ধৈর্যের সঙ্গে ঐ জমিতে বসবাসকারী জনগণের সঙ্গে আগে থেকে নিবিড় সংলাপে বসতে হবে।

বিআইডিএস সেমিনারে আমরা জানতে পারলাম বাংলাদেশের মোট জমির পরিমাণ বাড়ছে। সেটা দক্ষিণাঞ্চলগুলোতে বদ্বীপের মাধ্যমে। সেই দ্বীপাঞ্চলগুলোতে বনভূমি তৈরি করা হয়েছে এবং হরিণ ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এখন বাঘ ছাড়ার কথাও উঠেছে। কিন্তু অনায়াসেই এইসব জায়গায় বিরাট পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা যায়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে সেই জায়গায় পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার ক্ষমতা বা ইচ্ছা সরকারের বা সাহসী উদ্যোক্তাদের কারোরই নেই। সবচেয়ে দুর্বল যে তার জমিটিই কেড়ে নিতে হবে। কারণ সেটাই সবচেয়ে সোজা! সম্প্রতি হবিগঞ্জে চা শ্রমিকদের শত শত বিঘা কৃষিজমি যা তারা দেড়শ বছর ধরে চাষাবাদ করে আসছেন, সেটা স্পেশাল ইকোনোমিক জোনের নাম করে দখল করা হচ্ছে। অধ্যাপক মেসবাহ কামালের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী সেখানে একটি শ্রমিক পরিবারের ২ জন মহিলা সদস্য দৈনিক ৬৯ টাকা রোজ হিসেবে আয় করেন ১৩৮ টাকা কিন্তু তাতে পাঁচজনের পরিবার মোটেও চলে না। মালিক সেজন্যই তাদেরকে এই কৃষি জমিটুকু দিয়েছে যাতে তারা খাবার জোগাড় করতে পারেন। বাংলাদেশের ভূমি আইন অনুযায়ী কেউ যদি ১২ বছর ভূমি দখল করে রাখেন তাহলে সেখানে তাদের একধরনের স্বত্ব কায়েম হয়ে যায়। চা বাগানের এই আদিবাসী শ্রমিকদের ১৫০ বছরের ভোগ দখলি কৃষিজমি সরকার বাহাদুর কেন নিয়ে নিবেন তা মোটেও বোধগম্য নয়। এটা প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বিরোধী কাজ এবং ভূমি আইন বিরোধী কাজ। কিন্তু নিশ্চয়ই সেখানে শক্তিশালী ধনাঢ্য গ্রুপ রয়েছে যার জন্য সেটার মধ্যে নজর পড়েছে।

বাংলাদেশে যত মামলা হয় তার অর্ধেকের বেশি হয় ভূমি মালিকানা মামলা। বাংলাদেশে যত খাস জলাভূমি আছে তার একটা বিরাট অংশ ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত করে দেয়ার পরও তাদের হাতে তা আর থাকেনি। হাত ঘুরে তা এখন প্রভাবশালী মহলের মালিকানায় চলে এসেছে।

অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের হিসাব অনুযায়ী ভূমিহীনদের বরাদ্দকৃত জমির ৫৬ শতাংশ তাদের মালিকানায় তারা ধরে রাখতে পারেনি। বিআইডিএস সেমিনারে ভূমি সংক্রান্ত একটি ডিজিটাল ইনফরমেশন সিস্টেমের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিভাগে বিভিন্ন ভূমির রেকর্ড একজায়গায় করে প্লট বাই প্লট ভূমির বর্তমান অবস্থান ও ব্যবহার এবং মালিকানা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এই কাজটি ঠিকমত হলে বেআইনিভাবে দখলকৃত খাস জমি চিহ্নিত করাও সহজ হবে। একাজটি শুরু হয়েছে কিন্তু কবে যে শেষ হবে তা আমরা জানি না। চীনের দৃষ্টান্তটি প্রণিধানযোগ্য। সেখানে ভূমির মালিকানা দুই ভাগে নির্ধারিত হয়। শহরের জমির মালিক রাষ্ট্র, গ্রামাঞ্চলের জমির মালিক গ্রামের স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক সংস্থাগুলো। রাষ্ট্র এই স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার লোকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে শিল্প ও শহরের পরিসীমা বৃদ্ধি করার ফলে জমির ক্ষেত্রে একধরনের বাজার লেনদেন প্রথা তৈরি হয়েছে; যার উপরে সরকারের পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও সম্ভব হয়েছে। সেখানে ব্যক্তিগতভাবে জমি ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে বাজার অর্থনীতিতে সে ব্যবস্থা নেই। এখানে দুর্বল মালিক নানাভাবে জমি হারাচ্ছেন এবং সবল মালিকরা তা যা-তা দামে কিনে নিচ্ছেন অথবা দখল করে নিচ্ছেন। এতে শুধু অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে না, রক্তারক্তিও হচ্ছে। এবং জমির সার্বিক কল্যাণকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

আমার আলোচনায় সেদিন আমি একটি বিকল্প জমি ব্যাংকের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সরকার যদি একটি জমি ব্যাংক (Land Bank) স্থাপন করেন এবং নিজেই জমি কিনে নেন অথবা যেসব জমির মালিক জমিতে আটকে থাকতে চাচ্ছেন না তাদের একটা জীবনব্যাপী পেনশনের ব্যবস্থা করে দেন অথবা শহরে তাদের জন্য যদি আলাদা ফ্ল্যাট তৈরি করে দেন তাহলে স্বেচ্ছায় গ্রামের জমিগুলো তারা হয়তো সরকারকে দিয়ে দেবেন। পরবর্তীতে পরিকল্পিত গ্রামীণ উন্নয়নের কাঠামোতে ঐ জমিগুলোর ভারসাম্যপূর্ণ কৃষিজ ও অকৃষিজ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তাহলেই আমরা উন্নয়নের একটি দানবীয় মূর্তির বদলে মানবিক মূর্তির সাক্ষাত্ পাবো। জমিকে কেন্দ্র করেই এইধরনের একটি মাঝামাঝি পদ্ধতির সুষম পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

 



সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : 377        
   শেয়ার করুন
Share Button
   আপনার মতামত দিন
     উপসম্পাদকীয়
দৈনিক বিশ্ব মানচিত্র পত্রিকার উদ্যোগে “বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস উপলক্ষে” আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পীরজাদা শহীদুল হারুন।
.............................................................................................
বন্ধে যথাযথ উদ্যোগ নিক এনবিআর
.............................................................................................
এই বৈশাখে চাই মুক্তিবৃক্ষের আশীর্বাণী
.............................................................................................
বদিশেী মোবাইল কম্পানি কনে বায়োমট্রেকি ডাটাবইেজ বানাচ্ছ?
.............................................................................................
মানবিকীকরণ বাংলাদেশের ভূমি নীতির
.............................................................................................
আগামী পাঁচ বছরে বিচারব্যবস্থায় সুশাসন
.............................................................................................
ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি সময়ের দাবি
.............................................................................................
সোহরাওয়াদী উদ্যানে গাঁজা সেবনের মহোৎসব ঐতিহাসিক মর্যাদা ও পরিবেশ বিনষ্ট
.............................................................................................

|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: মো: হাবিবুর রহমান সিরাজ
আইন উপদেষ্টা : অ্যাড. কাজী নজিব উল্লাহ্ হিরু
সম্পাদক ও প্রকাশক : অ্যাডভোকেট মো: রাসেদ উদ্দিন
সহকারি সম্পাদক : বিশ্বজিৎ পাল
যুগ্ন সম্পাদক : মো: কামরুল হাসান রিপন
নির্বাহী সম্পাদক: মো: সিরাজুল ইসলাম
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : সাগর আহমেদ শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক বি এস প্রিন্টিং প্রেস ৫২ / ২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, সূত্রাপুর ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৯৯ মতিঝিল , করিম চেম্বার ৭ম তলা , রুম নং-৭০২ , ঢাকা থেকে প্রকাশিত ।
মোবাইল: ০১৭২৬-৮৯৬২৮৯, ০১৬৮৪-২৯৪০৮০ Web: www.dailybishowmanchitra.com
Email: news@dailybishowmanchitra.com, rashedcprs@yahoo.com
    2015 @ All Right Reserved By dailybishowmanchitra.com

Developed By: Dynamic Solution IT & Dynamic Scale BD