কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য আরও বাড়ানো ও বহুমুখী করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যুক্তরাষ্ট্র যখন তেহরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা জোরদার করছে, ঠিক সেই সময়ে মোদির এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেয়েছে।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার এসসিও শীর্ষ সম্মেলনের পার্শ্ববৈঠক হিসেবে সোমবার পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন মোদি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর গত ছয় মাসে দুই নেতার মধ্যে ফোনে যোগাযোগ হলেও এটিই ছিল তাঁদের প্রথম সরাসরি বৈঠক।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি বলেন, ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে আগামী দিনে দুই দেশের বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়ানো ও তা বহুমুখী করার কথা জানান তিনি।
মোদি আরও বলেন, পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টায় ভারত সমর্থন অব্যাহত রাখবে।
দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই নেতার প্রায় ৩০ মিনিটের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে চাবাহার বন্দরের বিষয়টি বৈঠকে ওঠেনি বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্দরটিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে ভারত।
বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতি এবং অঞ্চলটিতে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া নাবিকদের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে।
মোদি জানান, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে পেজেশকিয়ানকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি আবারও ভারতের সেই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন যে, সব সমস্যা সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
জয়সওয়াল বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অব্যাহত প্রচেষ্টার পাশাপাশি নৌ চলাচল ও বাণিজ্যের স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন মোদি।
যদিও ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে ভারতের বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে।
এছাড়াও মোদি বাণিজ্য বাড়ানোর পরিকল্পনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে ভারত কীভাবে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবে, সে বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকে প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মূলত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেসব নতুন সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো খুঁজে দেখার কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন, বিমা, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমানে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্য বেসরকারি পক্ষগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব পক্ষকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও বাস্তবতা মোকাবিলা করেই বাণিজ্য করতে হয়।
চাবাহার বন্দর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে পরিবহন ও সামুদ্রিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে বন্দরটির বিষয়টি উত্থাপন করা হলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, চাবাহারের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ভারত বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে একটি টেকসই পথ খুঁজে বের করা যায়, বিশেষ করে অঞ্চলটিতে চাবাহার বন্দরের ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।
চাবাহার বন্দরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড়ের মেয়াদ চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল শেষ হয়। এর ফলে ভারতকে ওই বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরে আসতে হয়।
ইরানের দূতাবাস পেজেশকিয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সক্ষমতা ইরান ও ভারতের রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারলে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রেসিডেন্ট মোদিকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারতের বিস্তৃত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ ও রক্তপাতের পথ থেকে সরে এসে সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরতে সহায়তা করার অনুরোধও করেছেন।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। একই সময়ে ওয়াশিংটন তেহরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ ঘোষণা করে। দেশটির ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট তেহরানের বিরুদ্ধে এটিকে অর্থনৈতিক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, যারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখছে, তাদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
মোদি এদিন আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, ওষুধ, খনিজ, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
সূত্র: দ্য প্রিন্ট