সৌদি আরবের বেসামরিক নাগরিক ও বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার কড়া জবাব হিসেবে ইয়েমেনজুড়ে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ৮২টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। সম্প্রতি রিয়াদ ও আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলায় তিনজন নিহত ও ৩৬ জন আহত হওয়ার পর যৌথ বাহিনী ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থানে এই ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।সৌদি প্রেস এজেন্সিতে (এসপিএ) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বেসামরিক নাগরিক ও অসামরিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা কোনোভাবেই শাস্তিহীন পার পাবে না। তিনি জানান, যৌথ বাহিনী ইয়েমেনের সাাদা, আল-হুদায়দাহ, আল-জাওফ এবং মারিব গভর্নরেটে সমন্বিত অভিযান চালিয়েছে। ধ্বংস করা লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে সাাদা প্রদেশের পাহাড়ে অবস্থিত ১১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার, বেশ কয়েকটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রের ডিপো এবং হুতি বাহিনীর অবস্থানস্থল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।সৌদির অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো ওই রক্তক্ষয়ী ঘটনার পরপরই এই সামরিক অভিযান জোরদার করা হয়। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় এক মরোক্কান ও এক আলজেরিয়ান নারী নিহত হন এবং আহত হন ২৮ জন। অন্যদিকে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় এক সুদানির প্রাণহানি ঘটে এবং আরও আটজন আহত হন। জোট বাহিনী আরও জানিয়েছে যে, তারা বুধবার রিয়াদের উদ্দেশ্যে ছোঁড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে। আল-মালিকি জানান, সানায় যে উৎক্ষেপণ মঞ্চ থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোঁড়া হয়েছিল, পরবর্তীতে সৌদি আরবে আরেকটি আক্রমণের প্রস্তুতির সময় সেটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।বছরের পর বছর ধরে কিছুটা শান্ত থাকার পর সম্প্রতি সংঘাত তীব্র রূপ নেওয়ায় এই হামলা ও পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ইয়েমেনের পশ্চিম লোহিত সাগর উপকূল এবং কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা পুনর্দখল করতে সৌদি আরব এবং মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী একটি প্রধান স্থল ও বিমান অভিযান শুরু করেছে। এই সংঘর্ষের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ধুবাব এবং মোখা বন্দরের আশেপাশের এলাকাগুলো। উল্লেখ্য, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ লোহিত সাগরের এই বাব আল-মানদাব প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হুতিরা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।বিদ্যমান এই অচলাবস্থা ও সহিংসতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও নৌ-পরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রিয়াদ বারবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন তেল ও সামরিক সম্পদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে কিং খালিদ বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত সৌদি আরামকোর জ্বালানি ট্যাংক এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতির চারপাশে নতুন সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ দ্য ওয়ার উল্লেখ করেছে, হুতিরা বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনার মতো বেসামরিক পরিকাঠামোয় আক্রমণ চালিয়ে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়াতে চাইছে, যাতে রিয়াদকে তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা যায়।আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে হুতিদের হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সব ধরনের সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে সৌদি জোট। জোট মুখপাত্র আল-মালিকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে সমর্থন করা অব্যাহত থাকবে। দক্ষিণ লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদাব প্রণালিতে সাধারণ জাহাজ চলাচলের ওপর হুতিদের এই হুমকিকে তিনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।নতুন করে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ পরিস্থিতি এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপির মতে, সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং দুই লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও হুশিয়ারি দিয়েছে যে, যুদ্ধপীড়িত এলাকায় কলেরা ও অপুষ্টি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে হুতিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশের বিশাল এলাকা দখল করে নিলে এই সংকটের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করতে ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। পরবর্তীতে ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘদিন আপেক্ষিক শান্তি বজায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক ভূখণ্ডগত অগ্রগতি ও নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় এই দীর্ঘদিনের যুদ্ধটি আবার পূর্ণ মাত্রায় ফিরে এসেছে। জোটের সাম্প্রতিক এই অভিযান এটিই ইঙ্গিত দেয় যে বেসামরিক সীমানা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় সৌদি বাহিনী আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সূত্র: আরব নিউজ