ঢাকা ১২:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়ারপুর ইউপিতে রাজস্বের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, সচিব আফজালকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ট্রেড লাইসেন্স ও কর আদায়ে অসঙ্গতির অভিযোগ, ২ লাখ ৪০ হাজার টাকার লেনদেন থেকে প্রশাসক বদলি—নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার ৪ নম্বর ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ আফজাল হোসেনকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। ট্রেড লাইসেন্স ও কর আদায়ে অসঙ্গতি, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ, রাজস্ব হিসাবের গরমিল, প্রশাসক পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, কথিত বদলি ঠেকাতে অর্থ লেনদেন, দাপ্তরিক কাজে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততা এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।প্রতিবেদকের হাতে আসা কয়েকটি নথিতে রাজস্ব আদায়ের নির্দিষ্ট অঙ্ক দেখা গেলেও অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে আদায়কৃত অর্থ, রশিদ, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক হিসাবে জমার মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।নথিতে এক হিসাব, অভিযোগে অন্য অঙ্কইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স ও করসংক্রান্ত কয়েকটি নথি পর্যালোচনায় নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের হিসাব পাওয়া গেছে। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নথিতে উল্লেখিত অর্থের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।এতে প্রশ্ন উঠেছে—অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে তা কোন খাতে নেওয়া হয়েছে, এর বিপরীতে কী ধরনের রশিদ দেওয়া হয়েছে এবং আদায়কৃত অর্থের পুরোটা ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না?স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রাজস্ব রেজিস্টার, রশিদ বই, ভাউচার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।এক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৮০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগপ্রতিবেদকের হাতে থাকা একটি ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত নথিতে লাইসেন্স ফি, ভ্যাট এবং পেশা ও বাণিজ্যিক করসহ মোট ৫ হাজার ২৩০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক নথিতে বসতভিটা কর বাবদ আরও ৫ হাজার টাকা পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে।অর্থাৎ দৃশ্যমান নথিতে দুই খাতে মোট অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার ২৩০ টাকা।কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।অভিযোগটি সত্য হলে নথিতে উল্লেখিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত ৬৯ হাজার ৭৭০ টাকা কোন খাতে নেওয়া হয়েছে এবং সেই অর্থ সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ, রশিদে ২ লাখ ৮০ হাজারঅন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।অন্যদিকে প্রতিবেদকের হাতে আসা ইউনিয়ন পরিষদের একটি হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় রশিদে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা উল্লেখ রয়েছে। ফলে অভিযোগে উল্লিখিত অঙ্কের সঙ্গে রশিদে থাকা অর্থের মধ্যে ৪০ হাজার টাকার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।এই ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা কোন খাতে নির্ধারণ করা হয়েছিল, কীভাবে হিসাব করা হয়েছে এবং অর্থটি ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যেও এনালগ ভাউচার কেন?অভিযোগকারীদের দাবি, রাজস্ব আদায় ও ট্রেড লাইসেন্স কার্যক্রমে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু লেনদেনে এনালগ ভাউচার ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি রাজস্ব হিসেবে আদায় করা প্রতিটি টাকার হিসাব রশিদ, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক হিসাবে থাকার কথা। এসব নথির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকলে তার কারণ কী?তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ের সব এনালগ ও ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।প্রশাসক বদল নিয়েও প্রশ্নগত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।অভিযোগ রয়েছে, আগের প্রশাসককে পরিবর্তন করে সচিব আফজাল হোসেনের পছন্দের একজনকে দায়িত্বে আনা হয়েছে।এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রশাসক পরিবর্তনের সরকারি আদেশ, নোটশিট, সুপারিশ, অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।তাদের প্রশ্ন—প্রশাসক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কোনো ভূমিকা ছিল কি না?বদলি ঠেকাতে ১০–১২ লাখ টাকার অভিযোগসচিব আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত বদলি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে বাতিল বা ঠেকানো হয়েছে।এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বদলি আদেশ, বাতিল বা স্থগিতের নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না—তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।স্থানীয়দের বক্তব্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সত্য না হলে অভিযোগের বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।বহিরাগত মিরাজকে দিয়ে অফিস পরিচালনার অভিযোগইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কাজে ‘মিরাজ’ নামের একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।এ বিষয়ে সচিব মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোঃ সালাউদ্দিন বাবুর ভাই বিপ্লব দেওয়ানের হস্তক্ষেপে অফিস পরিচালনার জন্য মিরাজকে নেওয়া হয়েছে।এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি দাপ্তরিক কাজে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো লিখিত অনুমোদন বা বিধিসম্মত ভিত্তি রয়েছে কি না।স্থানীয়দের দাবি, এ বিষয়টিও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।প্রাইভেটকার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্নআফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য ঢাকা মেট্রো-গ-১৩-৬১১৮ নম্বরের একটি প্রাইভেটকার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।গাড়িটির মালিকানা, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো সরকারি অর্থ বা সুবিধা যুক্ত কি না—এসব বিষয়ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবিআফজাল হোসেনের সম্পদের উৎস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, সাভার ও উত্তরখান এলাকায় তার একাধিক মূল্যবান বাড়ি রয়েছে।এসব সম্পত্তির মালিকানা, ক্রয় বা নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থের উৎস যাচাই করতে ভূমি রেকর্ড, দলিল, আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।একের পর এক অভিযোগ, তদন্তের দাবিরাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে প্রশাসক পরিবর্তন, কথিত বদলি ঠেকাতে অর্থ লেনদেন, বহিরাগত ব্যক্তির দাপ্তরিক সম্পৃক্ততা এবং সম্পদের উৎস—বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় বিষয়গুলো এখন তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠার পরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে কি না।তাদের দাবি, অভিযোগগুলো চাপা না দিয়ে নথিপত্রের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাই করা হোক।সাধারণ জনগণের জোরালো দাবিইয়ারপুর ইউনিয়নের সাধারণ জনগণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন—১. পূর্ণাঙ্গ রাজস্ব অডিট: ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, বসতভিটা করসহ সব ধরনের রাজস্ব আদায়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট করতে হবে।২. প্রতিটি টাকার হিসাব যাচাই: রশিদ, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট মিলিয়ে আদায়কৃত প্রতিটি টাকার হিসাব পরীক্ষা করতে হবে।৩. আর্থিক অভিযোগ তদন্ত: ৮০ হাজার টাকা ও ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট সব লেনদেনের উৎস ও সরকারি হিসাবে জমার তথ্য যাচাই করতে হবে।৪. প্রশাসক বদলের তদন্ত: ২৭ সেপ্টেম্বরের প্রশাসক পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়া, সুপারিশ, নোটশিট ও অনুমোদন যাচাই করে কার কী ভূমিকা ছিল তা খতিয়ে দেখতে হবে।৫. কথিত বদলি বাণিজ্যের তদন্ত: বদলি ঠেকাতে ১০–১২ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।৬. বহিরাগত ব্যক্তির ভূমিকা যাচাই: ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কাজে মিরাজের সম্পৃক্ততার বৈধতা ও অনুমোদন খতিয়ে দেখতে হবে।৭. সম্পদের উৎস যাচাই: সচিবের নামে থাকা কথিত সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।৮. অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা: তদন্তে সরকারি অর্থের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।স্থানীয় সাধারণ জনগণের দাবি, কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়—ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।তাদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করতে হবে।এখন দেখার বিষয়, ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং সরকারি রাজস্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
  • আপডেট সময় : ০৫:০৩:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ৬০ বার পড়া হয়েছে
Logo
শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ফজরসময়
জোহরসময়
আসরসময়
মাগরিবসময়
ইশাসময়
সূর্যোদয় :সময়সূর্যাস্ত :সময়

ইয়ারপুর ইউপিতে রাজস্বের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, সচিব আফজালকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

আপডেট সময় : ০৫:০৩:২৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

ট্রেড লাইসেন্স ও কর আদায়ে অসঙ্গতির অভিযোগ, ২ লাখ ৪০ হাজার টাকার লেনদেন থেকে প্রশাসক বদলি—নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার ৪ নম্বর ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ আফজাল হোসেনকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। ট্রেড লাইসেন্স ও কর আদায়ে অসঙ্গতি, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ, রাজস্ব হিসাবের গরমিল, প্রশাসক পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, কথিত বদলি ঠেকাতে অর্থ লেনদেন, দাপ্তরিক কাজে বহিরাগত ব্যক্তির সম্পৃক্ততা এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।প্রতিবেদকের হাতে আসা কয়েকটি নথিতে রাজস্ব আদায়ের নির্দিষ্ট অঙ্ক দেখা গেলেও অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে আদায়কৃত অর্থ, রশিদ, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক হিসাবে জমার মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।নথিতে এক হিসাব, অভিযোগে অন্য অঙ্কইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স ও করসংক্রান্ত কয়েকটি নথি পর্যালোচনায় নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের হিসাব পাওয়া গেছে। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নথিতে উল্লেখিত অর্থের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।এতে প্রশ্ন উঠেছে—অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে তা কোন খাতে নেওয়া হয়েছে, এর বিপরীতে কী ধরনের রশিদ দেওয়া হয়েছে এবং আদায়কৃত অর্থের পুরোটা ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না?স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রাজস্ব রেজিস্টার, রশিদ বই, ভাউচার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।এক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৮০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগপ্রতিবেদকের হাতে থাকা একটি ট্রেড লাইসেন্স-সংক্রান্ত নথিতে লাইসেন্স ফি, ভ্যাট এবং পেশা ও বাণিজ্যিক করসহ মোট ৫ হাজার ২৩০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের নামে পৃথক নথিতে বসতভিটা কর বাবদ আরও ৫ হাজার টাকা পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে।অর্থাৎ দৃশ্যমান নথিতে দুই খাতে মোট অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার ২৩০ টাকা।কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ৮০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।অভিযোগটি সত্য হলে নথিতে উল্লেখিত অর্থের বাইরে অতিরিক্ত ৬৯ হাজার ৭৭০ টাকা কোন খাতে নেওয়া হয়েছে এবং সেই অর্থ সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ, রশিদে ২ লাখ ৮০ হাজারঅন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।অন্যদিকে প্রতিবেদকের হাতে আসা ইউনিয়ন পরিষদের একটি হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় রশিদে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা উল্লেখ রয়েছে। ফলে অভিযোগে উল্লিখিত অঙ্কের সঙ্গে রশিদে থাকা অর্থের মধ্যে ৪০ হাজার টাকার পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।এই ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা কোন খাতে নির্ধারণ করা হয়েছিল, কীভাবে হিসাব করা হয়েছে এবং অর্থটি ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যেও এনালগ ভাউচার কেন?অভিযোগকারীদের দাবি, রাজস্ব আদায় ও ট্রেড লাইসেন্স কার্যক্রমে ডিজিটাল ব্যবস্থার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু লেনদেনে এনালগ ভাউচার ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি রাজস্ব হিসেবে আদায় করা প্রতিটি টাকার হিসাব রশিদ, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক হিসাবে থাকার কথা। এসব নথির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকলে তার কারণ কী?তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট সময়ের সব এনালগ ও ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।প্রশাসক বদল নিয়েও প্রশ্নগত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।অভিযোগ রয়েছে, আগের প্রশাসককে পরিবর্তন করে সচিব আফজাল হোসেনের পছন্দের একজনকে দায়িত্বে আনা হয়েছে।এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রশাসক পরিবর্তনের সরকারি আদেশ, নোটশিট, সুপারিশ, অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।তাদের প্রশ্ন—প্রশাসক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কোনো ভূমিকা ছিল কি না?বদলি ঠেকাতে ১০–১২ লাখ টাকার অভিযোগসচিব আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত বদলি ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে বাতিল বা ঠেকানো হয়েছে।এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বদলি আদেশ, বাতিল বা স্থগিতের নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না—তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।স্থানীয়দের বক্তব্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সত্য না হলে অভিযোগের বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।বহিরাগত মিরাজকে দিয়ে অফিস পরিচালনার অভিযোগইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কাজে ‘মিরাজ’ নামের একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।এ বিষয়ে সচিব মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোঃ সালাউদ্দিন বাবুর ভাই বিপ্লব দেওয়ানের হস্তক্ষেপে অফিস পরিচালনার জন্য মিরাজকে নেওয়া হয়েছে।এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে—ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি দাপ্তরিক কাজে একজন বহিরাগত ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো লিখিত অনুমোদন বা বিধিসম্মত ভিত্তি রয়েছে কি না।স্থানীয়দের দাবি, এ বিষয়টিও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।প্রাইভেটকার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্নআফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য ঢাকা মেট্রো-গ-১৩-৬১১৮ নম্বরের একটি প্রাইভেটকার ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।গাড়িটির মালিকানা, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো সরকারি অর্থ বা সুবিধা যুক্ত কি না—এসব বিষয়ও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবিআফজাল হোসেনের সম্পদের উৎস নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, সাভার ও উত্তরখান এলাকায় তার একাধিক মূল্যবান বাড়ি রয়েছে।এসব সম্পত্তির মালিকানা, ক্রয় বা নির্মাণ ব্যয় এবং অর্থের উৎস যাচাই করতে ভূমি রেকর্ড, দলিল, আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।একের পর এক অভিযোগ, তদন্তের দাবিরাজস্ব আদায় থেকে শুরু করে প্রশাসক পরিবর্তন, কথিত বদলি ঠেকাতে অর্থ লেনদেন, বহিরাগত ব্যক্তির দাপ্তরিক সম্পৃক্ততা এবং সম্পদের উৎস—বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় বিষয়গুলো এখন তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠার পরও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে কি না।তাদের দাবি, অভিযোগগুলো চাপা না দিয়ে নথিপত্রের ভিত্তিতে সত্যতা যাচাই করা হোক।সাধারণ জনগণের জোরালো দাবিইয়ারপুর ইউনিয়নের সাধারণ জনগণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন—১. পূর্ণাঙ্গ রাজস্ব অডিট: ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, বসতভিটা করসহ সব ধরনের রাজস্ব আদায়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট করতে হবে।২. প্রতিটি টাকার হিসাব যাচাই: রশিদ, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, অনলাইন রেকর্ড ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট মিলিয়ে আদায়কৃত প্রতিটি টাকার হিসাব পরীক্ষা করতে হবে।৩. আর্থিক অভিযোগ তদন্ত: ৮০ হাজার টাকা ও ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট সব লেনদেনের উৎস ও সরকারি হিসাবে জমার তথ্য যাচাই করতে হবে।৪. প্রশাসক বদলের তদন্ত: ২৭ সেপ্টেম্বরের প্রশাসক পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়া, সুপারিশ, নোটশিট ও অনুমোদন যাচাই করে কার কী ভূমিকা ছিল তা খতিয়ে দেখতে হবে।৫. কথিত বদলি বাণিজ্যের তদন্ত: বদলি ঠেকাতে ১০–১২ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।৬. বহিরাগত ব্যক্তির ভূমিকা যাচাই: ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কাজে মিরাজের সম্পৃক্ততার বৈধতা ও অনুমোদন খতিয়ে দেখতে হবে।৭. সম্পদের উৎস যাচাই: সচিবের নামে থাকা কথিত সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।৮. অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা: তদন্তে সরকারি অর্থের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।স্থানীয় সাধারণ জনগণের দাবি, কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়—ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।তাদের ভাষ্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে তদন্তের মাধ্যমে সেটিও পরিষ্কার করতে হবে।এখন দেখার বিষয়, ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং সরকারি রাজস্ব ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।