তুরস্ক-রাশিয়া কি সরাসরি সংঘাতে জড়াচ্ছে?

তুর্কি-রুশ কৌশলগত অংশীদারিত্ব চরম উত্তেজনার মুখে। ইউক্রেনকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দূরপাল্লার আধুনিক অস্ত্র সরবরাহে তুরস্কের প্রস্তাবিত সামরিক চুক্তি মস্কোর জন্য চূড়ান্ত ‘রেড লাইন’ অতিক্রমের রূপ নিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ ফারহাদ ইব্রাগিমভ। রুশ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জ্যেষ্ঠ বক্তার মতে, এই এক ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যকার লাভজনক সম্পর্ক একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
সম্প্রতি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইউক্রেনে সম্ভাব্য অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে ওয়াশিংটন ও আঙ্কারার কাছে ব্যাখ্যা চাচ্ছে মস্কো। রাশিয়ার বক্তব্য হলো, এটি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয় বরং সমগ্র ইউক্রেন সংকটের ভবিষ্যৎ সমাধানের প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তুরস্ক একাধারে সংঘাতের অবসান ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্য সামরিক দিক থেকে ইউক্রেনকে শক্তিশালী করছে; এই বৈপরীত্যকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর চোখে দেখা হচ্ছে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ইঙ্গিত দিয়েছেন, তুরস্ক কৃষ্ণসাগরে হামলা না করার জন্য ইউক্রেনকে বার্তা দেওয়ার দাবি করলেও কাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম বা রুশ বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে তুরস্কের প্রকাশ্যে কোনো দৃঢ় অবস্থান দেখা যায়নি। রাশিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আজভ ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা হুমকি সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পশ্চিমা অস্ত্র পরিবহনে ব্যবহৃত নৌযান এবং অবকাঠামোতে রুশ হামলা অব্যাহত থাকবে।
চলতি বছরের ৬ আগস্ট মার্কিন কংগ্রেসের নথিতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কের সামরিক মজুদ থেকে ইউক্রেনে মার্কিন তৈরি অস্ত্র পুনর্নির্যাতের দুই ধাপের একটি প্রস্তাবের অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রস্তাবিত সামরিক প্যাকেজে রয়েছে ২৫৫.৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ১২টি এম২৭০ মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম (এমএলআরএস), ২ হাজার ৫২৪টি ক্লাস্টার বহনে সক্ষম এম২৬ রকেট এবং ৪৭ হাজারটি ২০৩ মিলিমিটারের এম৫০৯এ১ ক্লাস্টার আর্টিলারি শেল। দ্বিতীয় ধাপে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ২৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৭০টি এম৩৯ এটিএসিএমএস ট্যাকটিক্যাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। সার্বিকভাবে এর প্রারম্ভিক মূল্য প্রায় ২৮৩.৯ মিলিয়ন ডলার বলা হলেও আঙ্কারা ও কিয়েভের মধ্যকার চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত এখনও গোপন রয়েছে।
এই নথিগুলো এখনো সরাসরি অস্ত্র স্থানান্তরের চূড়ান্ত প্রমাণ না হলেও এটি নিশ্চিত করে যে তুর্কি সরকার ইউক্রেনকে এই অস্ত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরও তাতে সায় দিয়েছে। তুরস্ক পুরনো অস্ত্র সরিয়ে নিজেদের সামরিক আধুনিকায়নের যুক্তি দিলেও কিয়েভ এগুলো ব্যবহার করতে চায় তাদের আক্রমণাত্মক ক্ষমতা বাড়াতে। এটি সাধারণ কোনো সাঁজোয়া যান বা ড্রোন সরবরাহ নয়; ১৬৫ কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে ক্লাস্টার বোমার আঘাত হানতে সক্ষম এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র এবং এম২৭০ সিস্টেম রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে ভয়াবহ প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাস্তবতা হলো, রাশিয়া ও তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক জোট ছিল না। সিরিয়া বা লিবিয়ায় দুই দেশ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করেছে, কিংবা ক্রিমিয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছে। তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি কিংবা বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষেত্রে উভয় দেশ একটি অলিখিত নিয়মে ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। তবে দূরপাল্লার ও বিধ্বংসী অস্ত্র সরবরাহ সেই ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিযোগিতার সীমানাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একই সাথে ইউক্রেনকে ভারী অস্ত্র সরবরাহ করা এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইস্তাম্বুলকে আলোচনার প্ল্যাটফর্ম বানানোর চেষ্টা আঙ্কারার কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে চূড়ান্ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তুর্কি বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক গভীরতার কারণে এই একটি চুক্তি সম্পর্ক ধ্বংস করবে না। কিন্তু এই ধারণাকে একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইব্রাগিমভ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। আঙ্কারা তার মোট চাহিদার প্রায় ৩৭ শতাংশ (২২ বিলিয়ন ঘনমিটার) প্রাকৃতিক গ্যাস রাশিয়ার কাছ থেকে নেয়। এছাড়া ২০২৫ সালে প্রায় ৭০ লাখ রুশ পর্যটক তুরস্কে ভ্রমণ করেন, যা তুর্কি পর্যটন খাতের মূল চালিকাশক্তি। তদুপরি, ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয়ে রাশিয়ার অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে আক্কুয়ু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা কার্যকর হলে তুরস্কের ১০ শতাংশ বিদ্যুতের জোগান দেবে।
তুরস্কের বিদ্যমান ৩০ শতাংশেরও বেশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জাতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রাশিয়া যদি জ্বালানি সরবরাহ, পর্যটন কিংবা আক্কুয়ু প্রকল্পে অর্থায়ন সংকুচিত করে, তবে তুর্কি অর্থনীতি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী এক কাঠামোগত সংকটে পড়বে। ২০১৫ সালে রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনার পর যেভাবে তুরস্কের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছিল, বর্তমান সুদৃঢ় অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতার যুগে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া তুরস্কের জন্য আরও অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
মস্কো আবেগের বশে কাজ না করলেও এটি নিশ্চিত যে ইউক্রেন যদি এই মার্কিন অস্ত্র তুর্কি চ্যানেলের মাধ্যমে হাতে পায়, তবে রাশিয়া আর তুরস্ককে বিশেষ অংশীদার বা গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচনা করবে না। অস্ত্র সরবরাহে তুর্কি পরিবহন খাত বা সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবহৃত হলে রাশিয়া তাকে আর নিছক ‘বাণিজ্যিক অপারেশন’ হিসেবে দেখবে না, বরং নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে গণ্য করবে। সবমিলিয়ে, এই প্রস্তাবিত এটিএসিএমএস চুক্তিটি কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক বৈঠক দিয়ে সমাধানের বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক তুর্কি-রুশ সম্পর্কের এক কঠিন পরীক্ষা, যেখানে রেড লাইন অতিক্রম করলে আঙ্কারাকে এক অত্যন্ত চড়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
আরটির বিশ্লেষণ





















